‘এটি ১৯৪৫ নয়, ৮১তম অধিবেশন’: বৈশ্বিক আস্থা ফেরানোর অঙ্গীকারে জাতিসংঘে বাংলাদেশের খলিলুর রহমান
নিউজ২৪ইউএসএ.কম ডেস্ক, নিউইয়র্ক : যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, পারমাণবিক উত্তেজনার ঝুঁকি, দারিদ্র্য-বৈষম্য ও জলবায়ু সংকটের গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন অধিবেশনের যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে।
সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বক্তব্যেই জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চলমান বৈশ্বিক প্রশ্নকে সামনে আনেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতার সঙ্গে জাতিসংঘকেও পরিবর্তিত হতে হবে।
“এটি ১৯৪৫ নয়। এটি ৮১তম অধিবেশন। বিশ্ব এগিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে যেতে হবে, আর আমি সেই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করব,”—দায়িত্ব গ্রহণের পর বলেন তিনি।
নতুন অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all’। অর্থাৎ বৈশ্বিক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমন একটি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা, যা বিশ্বের সব দেশ ও মানুষের জন্য কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
বিদায়ী ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবকের কাছ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ঐতিহ্যবাহী আইসল্যান্ডিক কাঠের গ্যাভেল গ্রহণের মধ্য দিয়ে ড. খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন। এ সময় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ছয় অগ্রাধিকারে নতুন নেতৃত্ব
৮১তম অধিবেশনের জন্য ড. খলিলুর রহমান ছয়টি প্রধান অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছেন। এর প্রথমটি হলো—“Silence the guns, amplify the voices”—অর্থাৎ অস্ত্রের সংঘাত থামিয়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের জন্য মানুষের কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া।
এর পাশাপাশি কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে না রাখার ওপর জোর দিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে গতি বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি। জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব, মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা, শরণার্থী ও অভিবাসীদের সুরক্ষা, ডিজিটাল শাসন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং জাতিসংঘ সংস্কারও তার অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।
তার ঘোষিত কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভিন্ন পক্ষের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
গুতেরেস: আস্থা পুনর্গঠনই বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন অধিবেশনের উদ্বোধনী আয়োজনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
গুতেরেস বলেন, বিশ্ব এখন একাধিক যুদ্ধ ও সংঘাত, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, পারমাণবিক উত্তেজনার ঝুঁকি, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং দ্রুত অবনতিশীল জলবায়ু পরিস্থিতির মুখোমুখি। এমন বাস্তবতায় বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
তবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান সংকট মোকাবিলায় চাপের মুখে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রায়ই দায়মুক্তির সঙ্গে লঙ্ঘিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক অবিশ্বাস প্রয়োজনীয় সমাধানকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষয় করছে।
তারপরও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে গুতেরেস বলেন, কূটনীতি, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে সাধারণ পরিষদ হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও সদিচ্ছা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জানুয়ারিতে নতুন মহাসচিব, সামনে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন
৮১তম অধিবেশনের সময় জাতিসংঘের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াও এগিয়ে যাবে—নতুন মহাসচিব নির্বাচন। আন্তোনিও গুতেরেসের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন। ফলে সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠবে।
জাতিসংঘের বিকল্প নেই: বেয়ারবক
৮০তম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিশ্বে জাতিসংঘের বিকল্প তৈরি হয়নি।
তিনি সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘ ছাড়া একটি বিশ্বের কথা ভাবার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিভিন্ন সংকট ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এমন কোনো দিন বা এমন কোনো দেশ নেই, যা জাতিসংঘ না থাকলে ভালো অবস্থায় থাকবে।
বেয়ারবক জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা, শিশুদের শিক্ষা এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব ইতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের তুলনায় কম দৃশ্যমান হয়।
এদিকে, সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—বিভক্ত ও অবিশ্বাসে জর্জরিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংলাপের পরিসর বাড়ানো এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়া। তার ঘোষিত মূল বার্তাই—বিশ্ব বদলে গেছে; সেই পরিবর্তনের সঙ্গে জাতিসংঘকেও বদলাতে হবে। UN Photo/Manuel Elías
- বি১/বি২ ভিসায় চাকরি-সাংবাদিকতা নয়, জন্ম পর্যটনেও নিষেধাজ্ঞা; ভিজিটর ভিসার অপব্যবহার নিয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা
- ‘এটি ১৯৪৫ নয়, ৮১তম অধিবেশন’: বৈশ্বিক আস্থা ফেরানোর অঙ্গীকারে জাতিসংঘে বাংলাদেশের খলিলুর রহমান
- ‘This Is Not 1945’: UN Opens 81st Session With Call to Rebuild Global Trust
- নিউইয়র্কের ‘লেবার পাওয়ার ১০০’-এ বাংলাদেশি-আমেরিকান মাফ মিসবাহ উদ্দিন
- ২৫ বছর পর ৯/১১: নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন, শুক্রবার যেভাবে স্মরণ করবে আমেরিকা
- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন
- বঙ্গবীর ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকীতে নিউইয়র্কে স্বদেশ ফোরামের ছড়া-কবিতা পাঠ ও আলোচনা
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন: সেলিম–আলী ও কুনু–ফিরোজ পরিষদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিল

